রাজশাহী নগরের দড়িখড়বোনা এলাকায় আওয়ামী লীগের এক নেতার ভাইকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল। গত বছরের ৬ মার্চের সেই সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে এক পক্ষের হাতে ছুরিকাহত হন রিকশাচালক গোলাম হোসেন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১১ মার্চ মৃত্যু হয় তাঁর। এ বিষয়ে ১৩ মার্চ নগরের বোয়ালিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন গোলাম হোসেনের স্ত্রী পরিবানু বেগম। মামলায় আসামিদের মধ্যে ছয়জনের নাম উল্লেখ আছে। তাঁরা হলেন নগরের শাহ মখদুম থানা বিএনপির আহ্বায়ক সুমন সরদার, চন্দ্রিমা থানা বিএনপির আহ্বায়ক ফাইজুর হক, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মীর তারেকসহ আরও তিনজন।
মামলা করার পর পরিস্থিতি বিপক্ষে চলে যায় পরিবানুর। তিনি নগর ছাড়তে বাধ্য হন। তবে মাসখানেক আগে নগরে ফিরলেও তাঁর কণ্ঠে অন্য সুর। তিনি আর স্বামী হত্যার বিচার চান না। অবশ্য এত দিনে ওই মামলার কোনো আসামিও গ্রেপ্তার হননি। তাঁরা ঘুরছেন প্রকাশ্যেই। অংশ নিচ্ছেন দলীয় কর্মসূচিতে। রিকশাচালক গোলাম হোসেন থাকতেন দড়িখড়বোনা এলাকার রেললাইনের পাশে ছোট্ট টিনশেড ঘরে। স্বামীর মৃত্যুর পর এক মাসও এই বাড়িতে থাকতে পারেননি পরিবানু। হঠাৎ গত ২৭ জুন সকালে নগরের রেলগেট এলাকায় পরিবানুর দেখা পাওয়া যায়। পরিবানু জানান, একটা খাবারের হোটেলে কাজ নিয়েছেন। তবে তিনি স্বামী হত্যার বিচার চান না আর। মামলা চালাবেন না। এত দিন কোথায় ছিলেন, জানতে চাইলে পরিবানু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘ছিলাম’।
কেন শহরে ছিলেন না জানতে চাইলে বলেন, ‘যে কয়দিন ছিলাম কোনো স্বস্তি ছিল না। দিনে তো লোকজন আসত, রাতবিরাতেও অচেনা লোকজন বাড়িতে এসে ডাকাডাকি করত। তারা বলত, এই মামলাটি তাদের মতো করে চালাতে হবে। তাই শহর থেকে চলে গিয়েছিলাম।’ মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবানু বলেন, ‘মামলা তো আর চালাব না। আসামিরা কেউ ধরা পড়েনি।’ পরিবানু জানান, তিনি যখন শহরে ছিলেন না, তখন মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন-অর-রশিদ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে ডেকে পাঠান। তিনি তাঁর চেম্বারে গিয়ে দেখা করেন। পরিবানু বলেন, ‘আমাকে তিনি বললেন, “তুমি কি মামলা চালাতে পারবা? না চালালে কিছু টাকা নিয়ে আপস করে নাও।” আমি তখন কিছুদিন সময় নিই। পরে তিনি আবার ডেকে পাঠান। এবার এসে চিন্তাভাবনা করে আমি জানাই, মামলা চালাব না। তখন আমাকে কিছু টাকা দেওয়া হয়েছে।’
এই মামলা আপসের বিষয়ে জানতে চাইলে কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন-অর-রশিদ বলেন, ‘আপনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাকে প্রশ্নটা করলেন। আইন আইনের গতিতেই চলবে।’ থানা সূত্র জানিয়েছে, এরই মধ্যে আসামি (শাহ মখদুম থানা বিএনপির আহ্বায়ক) সুমন সরদার ও (চন্দ্রিমা থানা বিএনপির আহ্বায়ক) ফাইজুর হক অভিযোগপত্র থেকে তাদের অব্যাহতি দেওয়ার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেছেন। অব্যাহতি দেওয়ার জন্য উচ্চ পর্যায় থেকে সুপারিশও করা হয়েছে। বোয়ালিয়া থানার ওসি মাছুমা মুস্তারী বলেন, ‘মামলার তদন্ত প্রায় শেষের দিকে। তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত বলা যাবে।’ আসামিদের গ্রেপ্তার না করার ব্যাপারে ওসি বলেন, ‘আসামিদের পাওয়া যায় না।’
এ ঘটনার পর রাজশাহীতে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রিকশাচালক গোলাম হোসেনের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী পরিবানু বেগমের ওপর চাপ প্রয়োগ করে মামলা থেকে সরে আসতে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পরিবানুর ওপর চাপ প্রয়োগের ঘটনায় বিএনপির কিছু নেতার সম্পৃক্ততা রয়েছে। তবে বিএনপি নেতৃত্ব এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, পরিবানু নিজেই মামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্যদিকে, আসামিরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা আসামিদের খুঁজছে কিন্তু তারা পলাতক। তবে স্থানীয় সূত্র বলছে, আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় পুলিশকে আরও সক্রিয় হতে হবে বলে দাবি জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ। তারা চান, রিকশাচালক গোলাম হোসেনের হত্যার বিচার হোক এবং অপরাধীদের শাস্তি হোক। অন্যদিকে, রাজশাহী বিএনপির ভেতরে এই ঘটনা নিয়ে নতুন করে বিভাজন তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। দলটির নেতৃত্ব এই সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বিষয়টি দলটির জন্য বিব্রতকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে, এই ঘটনা রাজশাহীর রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এই ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান করা। অন্যথায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা কমে যাবে। রিকশাচালক গোলাম হোসেনের পরিবার ন্যায়বিচার পেতে চায়। তাদের এই দাবি পূরণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এখন সময় এসেছে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে কঠোর হওয়ার। অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তাহলেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। অন্যথায় এই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং কোনো অন্যায় দেখলে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। তবেই সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় থাকবে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা এই ঘটনার রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করবে। এলাকাবাসীও তাদের সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছে। আশা করা যায়, পুলিশের তদন্তে অপরাধীদের শনাক্ত করে শাস্তি দেওয়া হবে এবং এলাকায় শান্তি ফিরে আসবে। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সবাই যেন আইন মেনে চলে এবং কাউকে অন্যায়ভাবে শাস্তি না দেয়, সেটাই প্রত্যাশা। অন্যথায় আইনের শাসন খর্ব হবে এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে। তাই সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস রাখতে হবে। তবেই একটি সুশৃঙ্খল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। রাজশাহীর এই ঘটনা সবার জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখন সময় এসেছে, সবাই মিলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করার। তাহলেই এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে। সাধারণ মানুষও যদি আইন হাতে তুলে নেয়, তাহলে সমাজে অরাজকতা তৈরি হবে। তাই সবার উচিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখা। শুধু তখনই ন্যায়বিচার সম্ভব। সেজন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়তা করতে হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নিলে তার পরিণতি মারাত্মক হতে পারে, যা এই ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে এবং আইনি পথে সমস্যার সমাধান করতে হবে। তা না হলে আরও বেশি মানুষ এ ধরনের ঘটনার শিকার হবেন। এটাই বাস্তবতা। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সবাই যেন সচেতন হয় এবং আইন মেনে চলে, সেটাই প্রত্যাশা।

সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন