ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনের নিচে পড়ে গিয়ে বেঁচে যাওয়া বাবা-ছেলের পরিচয় মিলেছে। এক বছর বয়সী শিশুটি সৌরভ এবং তার বাবার নাম জহিরুল ইসলাম সোহান (৩২)। শিশুর মায়ের নাম সুমাইয়া আক্তার।
কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলার লোহাজুড়ি ইউনিয়নের চরকাউনিয়া বাজার সংলগ্ন তাদের বাড়ি। বাবা জহিরুল ওমানপ্রবাসী। ঘটনার পর তিনি ৩০ এপ্রিল ভোরে ওমানের উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করেছেন।
মঙ্গলবার দুপুরে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে ভৈরব থেকে তিতাস কমিউটার ট্রেনে করে ঢাকা যাচ্ছিলেন জহিরুল। ট্রেনে ওঠার পর তার মনে পড়ে, প্রবাসে যাবেন অথচ ভুলবশত পাসপোর্ট সঙ্গে আনেননি। তখন তিনি পরিবার নিয়ে তড়িঘড়ি করে ট্রেন থেকে নামতে চান। হঠাৎ স্টেশন থেকে ট্রেনটি ছেড়ে দেয়।
স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার প্রথমে নামতে গিয়ে ট্রেনের হাতল ধরতে গেলে হাত ফসকে প্ল্যাটফর্মে পড়ে যান। পেছনে থাকা এক বছর বয়সী সৌরভ এ সময় ফাঁক দিয়ে পড়ে গিয়ে চলে যান ট্রেনের নিচে।
ঘটনা দেখে ছেলেকে বাঁচাতে ট্রেনের নিচে নেমে পড়েন বাবা এবং ছেলেকে জাপটে ধরে রেললাইনের পাশে শুয়ে থাকেন। তখন ট্রেনটি চলতে থাকে। একে একে আটটি বগি চলে যাওয়ার পর সন্তানসহ বেঁচে যান বাবা।
প্রত্যক্ষদর্শী ফালু মিয়া বলেন, ‘আমি তিতাস কাউন্টারে কাজ করি। ট্রেনটি যখন ছেড়ে দেয়, তখন দেখতে পাই কেউ একজন ট্রেনের নিচে পড়ে গেছে। দৌড়ে গিয়ে দেখি একজন ব্যক্তি তার সন্তানকে জড়িয়ে ট্রেনের নিচে পড়ে রয়েছেন। ব্যক্তিটির স্ত্রীও ট্রেনের নিচে যাওয়ার উপক্রম হলে আমিসহ অন্যরা তাকে আটকে রাখি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এক অলৌকিক ঘটনার মধ্য দিয়ে শিশুটি ও তার বাবা বেঁচে গেলেন। আমরা স্টেশনে থাকা সবাই আল্লাহর কাছে লাখো শুকরিয়া জানাই। এমন ঘটনায় কেউ বেঁচে ফেরে না। আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি।’
স্টেশনে থাকা দোকানি সোহেল মিয়া বলেন, ‘ঘটনাটি দেখে খুব আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। রাখে আল্লাহ মারে কে—এটাই বুঝতে পেরেছি।’
ভুক্তভোগী জহিরুল ইসলাম সোহান বুধবার রাতে বলেন, ‘এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল আমরা বাবা-ছেলে হয়তো পৃথিবীর আলো আর দেখতে পাব না। একটার পর একটা বগি শরীরের ওপর দিয়ে গেল। ভাবতে পারিনি বেঁচে যাব। ঘটনার পর সারারাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছি। আল্লাহ আমাদের বাঁচিয়েছেন।’
তিনি আরও জানান, ১০ বছর ধরে ওমানে প্রবাসে আছেন। দুই বছর আগে দেশে এসে বিয়ে করেন। গত বছর তাদের পুত্রসন্তান জন্ম নেয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে আসেন এবং চার মাস পর আবারও প্রবাসে যাত্রা করছেন। এজন্যই স্ত্রী ও ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার পথে এ ঘটনা ঘটে।
স্টেশন মাস্টার মো. ইউসুফ বলেন, ‘সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে যতটুকু জানা গেছে, ট্রেনটি ছাড়ার সময় দম্পতি সন্তানকে নিয়ে নামতে চাইছিলেন। যাত্রীদের সচেতনতার অভাব রয়েছে। বাবা-ছেলে বেঁচে যাওয়ায় আমরা অনেক খুশি হয়েছি।’
ভৈরব রেলওয়ে থানার এসআই আফজাল হোসেন বলেন, ‘ট্রেনে যাতায়াত করতে হলে সচেতনতার সঙ্গে উঠানামা করতে হবে। ২৮ এপ্রিল দুটি ঘটনা ঘটে। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বাবা-ছেলে বেঁচে যান। অন্যদিকে উপজেলার কালিকাপ্রসাদ এলাকায় এক যুবক ট্রেনের ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়ে পরে মারা যান।’
তিনি জানান, নিহত যুবকের নাম শাহীন মিয়া (৩৪)। তিনি কুলিয়ারচর পৌর শহরের চারারবন এলাকার রমজান মিয়ার ছেলে। যাত্রীদের সচেতন করতে রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে।
আটটি বগি মাথার ওপর দিয়ে চলে গেলেও বেঁচে গেলেন বাবা ও সন্তান – সত্যিই অলৌকিক বলতে হয় এই ঘটনাকে। প্রবাসী বাবার শেষ মুহূর্তের ভুলেই ঘটে যায় এ দুর্ঘটনা। কিন্তু ভাগ্য ও আল্লাহর রহমতে মৃত্যু হয়নি কারও। ঘটনাটি ফের স্মরণ করিয়ে দিল, ভিড়ে ট্রেনে ওঠানামার সময় কত সতর্ক থাকা জরুরি। স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, যাত্রীদের সচেতনতার অভাবেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। বাবা-ছেলের বেঁচে যাওয়া যেন আমাদের সবাইকে সতর্ক করে, এটাই প্রত্যাশা।

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন