দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, আসামি গ্রেফতার ও মামলার তদন্ত কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে পুলিশের উপ-পরিদর্শকদের (এসআই) সুদমুক্ত ঋণে মোটরসাইকেল কেনার সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে পরে তা আর বাস্তবায়ন হয়নি।
এখন পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ সামনে রেখে এই দাবি ফের সামনে এসেছে। সেই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী এ বাহিনী স্বতন্ত্র সাইবার ইউনিট এবং অপরাধ দমনে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত যেতে এভিয়েশন ইউনিট গঠনের প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে। এছাড়া পদোন্নতি, চিকিৎসা সম্প্রসারণ, ভাতা বৃদ্ধি, ডেপুটেশনে কাজের সুযোগ বাড়ানোসহ আরও কিছু দাবি রয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।
রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আগামী ১০ মে শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশের সবচেয়ে বড় আয়োজন ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’, যা চলবে ১৩ মে পর্যন্ত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশ সপ্তাহে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে অনুষ্ঠান বাদ রাখা হয়েছিল। তবে এবার পুলিশ সপ্তাহের তৃতীয় দিন বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের একটি অনুষ্ঠান রয়েছে।
প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়া তারেক রহমান এই আয়োজনের উদ্বোধন করবেন। তিনি পুলিশ সপ্তাহ প্যারেডে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন এবং কৃতিত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পুলিশ সদস্যদের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘পিপিএম’ ও ‘বিপিএম’ পদক পরিয়ে দেবেন।
তবে সরকারের ব্যয়সংকোচন নীতির কারণে এবারের আয়োজনে বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়েছে। সাত দিনের বদলে অনুষ্ঠান সীমিত করা হয়েছে চার দিনে। কমানো হয়েছে ইভেন্ট ও অতিথি সংখ্যা। এমনকি পদকপ্রাপ্তদের সংখ্যাও কমিয়ে আনা হয়েছে। এবারের পুলিশ সপ্তাহে ১০৭ জন সদস্য পদক পাচ্ছেন।
যদিও এক বছর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সাত দফা দাবি তুলে ধরেছিল পুলিশ বাহিনী। পুলিশ সপ্তাহ-২০২৫ উপলক্ষে উত্থাপিত এসব দাবির একটিও এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি বলে জানা গেছে। তবে এবার পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ফলে বর্তমান সরকার পুলিশের যৌক্তিক দাবিগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করবে।
এ বছর পুলিশ সপ্তাহে মোটরসাইকেল সুবিধাসহ আটটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে।
এ বিষয়ে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আলোচনা হয়। এতে যে কোনো তফসিলি ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে মত দেওয়া হয় এবং সরকার ওই ঋণের সুদ বহন করবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল, দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় কর্মরত পুলিশ সদস্যদের এ ঋণ সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেছিলেন, মোটরসাইকেল সুবিধা চালু হলে মাঠপর্যায়ে পুলিশের দ্রুত সাড়া দেওয়া ও তদন্ত কার্যক্রমে গতি বাড়বে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পরে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের কোনো অগ্রগতি হয়নি। কিন্তু পুলিশের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে এখনো প্রত্যাশা রয়ে গেছে।
সাইবার অপরাধ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে স্বতন্ত্র এবং বিভাগীয় শহরগুলোতে স্বয়ংসম্পূর্ণ সাইবার ইউনিট গঠনের প্রস্তাব করা হবে। বর্তমানে অধিকাংশ সাইবার কার্যক্রম কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হওয়ায় বাইরে কার্যকর সক্ষমতা তৈরি হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এছাড়া, সাধারণ পুলিশিংয়ের পাশাপাশি দেশে উগ্রবাদ, মাদক ও অস্ত্রপাচার, মানবপাচার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত গমনাগমনের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি এভিয়েশন ইউনিট প্রয়োজন বলে মনে করে পুলিশ। এজন্য ইতিমধ্যে ছয়জন পুলিশ অফিসারকে পাইলট ও ৪০ জন বিভিন্ন স্তরের পুলিশ অফিসারকে হেলিকপ্টার রক্ষণাবেক্ষণ-সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ সদস্যদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দাবিতে আরও একাধিক প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে:
পুলিশ সদস্যদের জন্য অনারারি পদোন্নতির ব্যবস্থা চালু করা
দেশের সব জেলা শহরে পুলিশ সদস্যদের সন্তানদের জন্য মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা
দীর্ঘদিন অপরিবর্তিত থাকায় তদন্ত ভাতা বাড়ানো
সমগ্র দেশে সমানভাবে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পৃথক পুলিশ মেডিকেল সার্ভিস সম্প্রসারণ
পুলিশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা (সাইকিয়াট্রিক সেবা) নিশ্চিত করা
অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা যৌক্তিক পর্যায়ে আনা
বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে পুলিশ কর্মকর্তাদের ডেপুটেশনে কাজের সুযোগ সম্প্রসারণ
বিদেশের বাংলাদেশ মিশন-দূতাবাসে পুলিশ লিয়াজোঁ অফিসার নিয়োগ
পদায়নের জন্য পুলিশের পছন্দের ছয়টি সংস্থার মধ্যে রয়েছে: দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।
একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশের পক্ষ থেকে যেসব দাবি বা প্রস্তাব করা হয়েছিল, তার একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। বর্তমান সরকারের সময় পুলিশের দাবি বাস্তবায়ন হবে, এমন প্রত্যাশা বাহিনীর সদস্যদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ায় বাহিনীর অভ্যন্তরে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। আধুনিক ও জনবান্ধব পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাঠামোগত সংস্কার এবং স্বচ্ছ নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া অপরিহার্য।’
এ বিষয়ে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা বলেন, ‘পুলিশ এই সমাজেরই একটি অংশ। যৌক্তিক যেসব দাবি রয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন জরুরি। তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা আরও দ্রুত উন্নত হবে।’
পুলিশে পদোন্নতি নিয়ে এসআই ও পরিদর্শকদের (ইন্সপেক্টর) ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা দীর্ঘদিনের। বাহিনীতে তারাই সংখ্যায় বেশি। তারাই তো তদন্তকারী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ভূমিকা রাখেন। অতএব এটা ইগনোর করা যাবে না।’
পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে এসআইদের জন্য বিনা সুদে মোটরসাইকেল ঋণ, স্বতন্ত্র সাইবার ও এভিয়েশন ইউনিট গঠনের প্রস্তাব তুলছে পুলিশ। গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এই দাবি জানালেও বাস্তবায়ন হয়নি। এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে প্রস্তাবগুলো যাবে। দাবিগুলো যৌক্তিক কি না এবং সরকার কতটা বাস্তবায়ন করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। পুলিশের দাবি বাস্তবায়িত হলে অপরাধ তদন্ত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিষয় : পুলিশ সপ্তাহ

শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ মে ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন