শপিংমল হোক কিংবা মুদির দোকান—টাকা পরিশোধের সময় বিকাশ, নগদ, রকেট অথবা অনলাইন ব্যাংকিং সেবার আলাদা আলাদা কিউআর কোড খোঁজার দিন শেষ। এখন একটি মাত্র কিউআর কোড স্ক্যান করেই যেকোনো গ্রাহক ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাপ থেকে অর্থ পরিশোধ করতে পারবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুনে সরকার কর্তৃক এই সর্বজনীন কিউআর কোড-ভিত্তিক সেবাটি সর্বত্র বাধ্যতামূলক করার মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যেই ৭৭ হাজার ১৬৫টি লেনদেনে মোট ২২ কোটি ২ লাখ টাকার বেশি আর্থিক পরিশোধ হয়েছে। দেশের বিচ্ছিন্ন ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে একক প্ল্যাটফর্মে এনে জনসাধারণের জন্য একটি নিরাপদ, স্বচ্ছ ও সহজ লেনদেন ব্যবস্থার মাধ্যমে ‘ক্যাশলেস ইকোনমি’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাংলা কিউআর হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্টার-অপারেবল জাতীয় কিউআর পেমেন্ট স্ট্যান্ডার্ড, যা প্রচলিত সকল মোবাইল ব্যাংকিং সেবাকে একটিমাত্র কিউআর কোডের আওতায় আনার মাধ্যমে সর্বজনীন পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করেছে। আগে বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিউআর কোড থাকায় একজন গ্রাহক কেবল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ দিয়েই অর্থ পরিশোধ করতে পারতেন। নতুন এই ব্যবস্থায় একজন ব্যবসায়ীর শুধু এই একটি কিউআর কোড তার কাছে বা দোকানে রাখলেই চলবে। এই একটি কিউআর স্ক্যান করে বিকাশ, নগদ, রকেট অথবা যেকোনো ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে মূল্য পরিশোধ করা যাবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে যেমন ব্যবসায়ীদের একাধিক কিউআর ব্যবহারের ঝামেলা ও ব্যয় কমবে, গ্রাহকদের জন্যও ডিজিটাল পেমেন্ট আরও সহজ ও সর্বজনীন হবে। বর্তমানে ৪৬টি ব্যাংক, সাতটি এমএফএস এবং চারটি পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত রয়েছে এবং প্রায় ৯ লাখ ৬৩ হাজার ছোট-বড় ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা বাংলা কিউআর ব্যবহার করছেন।
বাংলা কিউআর ব্যবহার করতে আলাদা কোনো অ্যাপের প্রয়োজন নেই। প্রথমে স্মার্টফোনে ব্যবহৃত ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (যেমন- বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি) অ্যাপটি খুলে ‘স্ক্যান কিউআর’ বা ‘পে উইথ কিউআর’ অপশনে যেতে হবে। এরপর ব্যবসায়ীর দোকানে প্রদর্শিত বাংলা কিউআর কোডটি স্ক্যান করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবসায়ীর তথ্য ও লেনদেনের বিবরণ পর্দায় দেখা যাবে। যদি কিউআর কোডটি স্ট্যাটিক হয়, তাহলে গ্রাহককে পরিশোধের পরিমাণ নিজে লিখতে হবে; আর ডাইনামিক হলে বিলের পরিমাণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রদর্শিত হবে। এরপর সতর্কতার সঙ্গে সব তথ্য যাচাই করে পিন, ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা অন্যান্য নিরাপত্তা যাচাইকরণের মাধ্যমে লেনদেন নিশ্চিত করলেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অর্থ গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে ব্যবসায়ীর হিসাবে যোগ হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশ ব্যাংকের ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (এনপিএসবি)-এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে সম্পন্ন হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলা কিউআর পেমেন্টে অতিরিক্ত চার্জ কাটা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়লেও বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান তথ্যটিকে ভুল বলে জানিয়েছেন। তিনি জানান, কেনাকাটার ক্ষেত্রে গ্রাহককে কোনো চার্জ দিতে হবে না; ক্রেতা হিসেবে শূন্য শতাংশ চার্জ দিয়েই পণ্য ক্রয় করা যাবে। তবে এই চার্জ দিতে হবে বিক্রেতাকে, অর্থাৎ মার্চেন্টকে। বিক্রেতা বা মার্চেন্টের খরচ হবে ১ হাজার টাকায় সর্বোচ্চ ১০ টাকা + ১৫ শতাংশ ভ্যাট, অর্থাৎ সর্বোচ্চ ১ শতাংশ হারে চার্জ প্রযোজ্য হবে। ফলে মার্চেন্টের খরচ হিসেবে গণ্য হবে মোট ১১ টাকা ৫০ পয়সা।
এলাকার চায়ের দোকান, মুদির দোকান থেকে শুরু করে শপিংমল, সিনেমা হল, অ্যামিউজমেন্ট পার্কসহ যেকোনো গণপরিবহনের ভাড়া পরিশোধ—বাংলা কিউআরের আওতাভুক্ত যেকোনো ব্যবসা বা আর্থিক লেনদেনেই এটি ব্যবহার করা যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু নগদ অর্থের ব্যবহার কমানো নয়, বরং মুদ্রা ছাপানোর ব্যয় হ্রাস, আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং সর্বজনীন ডিজিটাল পেমেন্টের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। ভবিষ্যতে সরকারি সেবার সব ধরনের অর্থ পরিশোধেও বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ইন্টারনেট ছাড়াই কিউআরভিত্তিক লেনদেন চালুর বিষয়েও কাজ চলছে। এ ছাড়া নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কিস্তিতে প্রায় ৩০ হাজার স্মার্টফোন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যেন আরও বেশি মানুষ ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় আসতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে কিউআর কোডের নবাগত ধারণাটি তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং গ্রামীণ গ্রাহকদের জন্য ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের আবশ্যকতার বিকল্প বের করা।

রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন