ঢাকা    মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬
ঢাকা    মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬
গণবার্তা

ভারতে এবার কি তাজমহল ভেঙে মন্দির করা হবে!

ভারতে এবার কি তাজমহল ভেঙে মন্দির করা হবে!

বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম তাজমহলের অস্তিত্ব নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক। ঐতিহাসিক এই স্মৃতিসৌধটির নিচে প্রাচীন মন্দিরের অস্তিত্ব আছে কি না, তা যাচাই করতে কেন জরিপ করা হবে না—তা জানতে চেয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়াকে (এএসআই) নোটিশ জারি করেছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈনের নেতৃত্বে আবেদনকারী পক্ষ দাবি করছে, তাজমহল আসলে মোগল সম্রাট শাহজাহানের তৈরি কোনো স্মৃতিসৌধ নয়, বরং এটি ভগবান মহাদেবের উদ্দেশে নিবেদিত প্রাচীন হিন্দু মন্দির ‘তেজো মহালয়া’। হিন্দুত্ববাদী এই আইনজীবীদের দাবি, ১১৫৫-৫৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজা পরমর্দি দেব এটি নির্মাণ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে মোগলরা এটি জোরপূর্বক দখল করে রূপান্তর করে।

এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি রোহিতরঞ্জন আগরওয়ালের বেঞ্চে শুনানির সময় বাদীপক্ষ তাজমহল প্রাঙ্গণের ভেতরে হিন্দুদের পূজা করার অনুমতি ও সৌধটি জরিপের জন্য অ্যাডভোকেট-কমিশনার নিয়োগের আবেদন জানায়। অতীতে আগ্রার নিম্ন আদালত পর্যাপ্ত নথিপত্রের অভাব দেখিয়ে এই আবেদন খারিজ করে দিলেও, এবার সেই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন আবেদনকারীরা। ইউনেস্কো স্বীকৃত এই হেরিটেজ সাইট সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মতে, ১৬৩১ থেকে ১৬৫৩ সালের মধ্যে মোগল সম্রাট শাহজাহান তার প্রিয় পত্নী মমতাজ মহলের স্মৃতিতে এটি নির্মাণ করেন। তবে আবেদনকারী পক্ষের দাবি, তাদের কাছে ১০৯টি প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ রয়েছে যা প্রমাণ করে এটি একটি মন্দির। এছাড়াও, এএসআই কর্তৃক তাজমহলে নামাজ পড়ার অনুমতি প্রদান এবং সৌধের কিছু অংশ তালাবদ্ধ রাখার বিষয়টিও তাদের আবেদনে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ মামলার ঐতিহাসিক রায়ের পর থেকে ভারতে ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর আদি পরিচয় নিয়ে নানা মামলা দায়ের করা হচ্ছে। তাজমহল নিয়ে এই নতুন আইনি পদক্ষেপ সেই বিতর্কেরই এক নতুন অধ্যায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আবেদনকারীদের মূল লক্ষ্য হলো—তাজমহলের ভেতরে ছবি ও ভিডিওগ্রাফির মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে আদালতের মাধ্যমে সৌধটির ‘হিন্দু মন্দির’ হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করা। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে উচ্চ আদালত। এই মামলার চূড়ান্ত রায় কেবল তাজমহলের ধর্মীয় পরিচয়ের বিতর্কই উসকে দেবে না, বরং ভারতের প্রাচীন স্থাপনা ও ইতিহাস রক্ষায় এক নতুন আইনি নজির তৈরি করবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে, তাজমহলের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে এই বিতর্কের প্রভাব পড়েছে সমাজের বিভিন্ন স্তরে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো এই আবেদনকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা দাবি করেছে, ইতিহাসের সঠিক তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন। অন্যদিকে, মুসলিম সংগঠনগুলো এই আবেদনের তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা বলেছে, তাজমহল বিশ্বের একটি ঐতিহ্য, এটি কোনো ধর্মীয় সম্পত্তি নয়। তাদের মতে, এই ধরনের মামলা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করবে। ঐতিহাসিকরাও এই আবেদনকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলে উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন, তাজমহল নির্মাণের পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে। মোগল স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন এই সৌধের সঙ্গে হিন্দু মন্দিরের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে হাইকোর্টের নোটিশের পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। এএসআই এখন তাদের অবস্থান স্পষ্ট করবে। তারা হয় তাজমহলের মোগল স্থাপত্যের প্রমাণ দেবে, নয়তো জরিপের অনুমতি দেবে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই মামলার পরবর্তী শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। এই মামলার রায় ভারতের ঐতিহ্য ও ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, আদালত কী সিদ্ধান্ত নেয়। তাজমহলের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কী মোড় নেয়, সেদিকে তাকিয়ে আছে গোটা দেশ। সব মিলিয়ে, তাজমহল নিয়ে এই নতুন আইনি লড়াই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এটি শুধু একটি সৌধের ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং ভারতের ঐতিহাসিক বক্তৃতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্যও একটি পরীক্ষা। আদালতের সিদ্ধান্ত এই বিতর্কের সমাধান করবে নাকি আরও জটিল করবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত, তাজমহলের গায়ে নতুন করে পড়েছে প্রশ্নচিহ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার অধিকার সবার রয়েছে। কিন্তু সেই খোঁজ যাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট না করে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ঐতিহাসিক সত্য উদঘাটন করা জরুরি, কিন্তু তা হতে হবে বিজ্ঞানসম্মত ও নিরপেক্ষ উপায়ে। আশা করা যায়, আদালত সেই পথেই এগিয়ে যাবে। আর তাজমহলের মহিমা অক্ষুণ্ণ থাকবে, সেটাই সবার কামনা।

আপনার মতামত লিখুন

গণবার্তা

মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬


ভারতে এবার কি তাজমহল ভেঙে মন্দির করা হবে!

প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুলাই ২০২৬

featured Image
বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম তাজমহলের অস্তিত্ব নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক। ঐতিহাসিক এই স্মৃতিসৌধটির নিচে প্রাচীন মন্দিরের অস্তিত্ব আছে কি না, তা যাচাই করতে কেন জরিপ করা হবে না—তা জানতে চেয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়াকে (এএসআই) নোটিশ জারি করেছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈনের নেতৃত্বে আবেদনকারী পক্ষ দাবি করছে, তাজমহল আসলে মোগল সম্রাট শাহজাহানের তৈরি কোনো স্মৃতিসৌধ নয়, বরং এটি ভগবান মহাদেবের উদ্দেশে নিবেদিত প্রাচীন হিন্দু মন্দির ‘তেজো মহালয়া’। হিন্দুত্ববাদী এই আইনজীবীদের দাবি, ১১৫৫-৫৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজা পরমর্দি দেব এটি নির্মাণ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে মোগলরা এটি জোরপূর্বক দখল করে রূপান্তর করে।এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি রোহিতরঞ্জন আগরওয়ালের বেঞ্চে শুনানির সময় বাদীপক্ষ তাজমহল প্রাঙ্গণের ভেতরে হিন্দুদের পূজা করার অনুমতি ও সৌধটি জরিপের জন্য অ্যাডভোকেট-কমিশনার নিয়োগের আবেদন জানায়। অতীতে আগ্রার নিম্ন আদালত পর্যাপ্ত নথিপত্রের অভাব দেখিয়ে এই আবেদন খারিজ করে দিলেও, এবার সেই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন আবেদনকারীরা। ইউনেস্কো স্বীকৃত এই হেরিটেজ সাইট সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মতে, ১৬৩১ থেকে ১৬৫৩ সালের মধ্যে মোগল সম্রাট শাহজাহান তার প্রিয় পত্নী মমতাজ মহলের স্মৃতিতে এটি নির্মাণ করেন। তবে আবেদনকারী পক্ষের দাবি, তাদের কাছে ১০৯টি প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ রয়েছে যা প্রমাণ করে এটি একটি মন্দির। এছাড়াও, এএসআই কর্তৃক তাজমহলে নামাজ পড়ার অনুমতি প্রদান এবং সৌধের কিছু অংশ তালাবদ্ধ রাখার বিষয়টিও তাদের আবেদনে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ মামলার ঐতিহাসিক রায়ের পর থেকে ভারতে ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর আদি পরিচয় নিয়ে নানা মামলা দায়ের করা হচ্ছে। তাজমহল নিয়ে এই নতুন আইনি পদক্ষেপ সেই বিতর্কেরই এক নতুন অধ্যায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আবেদনকারীদের মূল লক্ষ্য হলো—তাজমহলের ভেতরে ছবি ও ভিডিওগ্রাফির মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে আদালতের মাধ্যমে সৌধটির ‘হিন্দু মন্দির’ হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করা। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে উচ্চ আদালত। এই মামলার চূড়ান্ত রায় কেবল তাজমহলের ধর্মীয় পরিচয়ের বিতর্কই উসকে দেবে না, বরং ভারতের প্রাচীন স্থাপনা ও ইতিহাস রক্ষায় এক নতুন আইনি নজির তৈরি করবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।এদিকে, তাজমহলের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে এই বিতর্কের প্রভাব পড়েছে সমাজের বিভিন্ন স্তরে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো এই আবেদনকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা দাবি করেছে, ইতিহাসের সঠিক তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন। অন্যদিকে, মুসলিম সংগঠনগুলো এই আবেদনের তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা বলেছে, তাজমহল বিশ্বের একটি ঐতিহ্য, এটি কোনো ধর্মীয় সম্পত্তি নয়। তাদের মতে, এই ধরনের মামলা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করবে। ঐতিহাসিকরাও এই আবেদনকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলে উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন, তাজমহল নির্মাণের পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে। মোগল স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন এই সৌধের সঙ্গে হিন্দু মন্দিরের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে হাইকোর্টের নোটিশের পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। এএসআই এখন তাদের অবস্থান স্পষ্ট করবে। তারা হয় তাজমহলের মোগল স্থাপত্যের প্রমাণ দেবে, নয়তো জরিপের অনুমতি দেবে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই মামলার পরবর্তী শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। এই মামলার রায় ভারতের ঐতিহ্য ও ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, আদালত কী সিদ্ধান্ত নেয়। তাজমহলের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কী মোড় নেয়, সেদিকে তাকিয়ে আছে গোটা দেশ। সব মিলিয়ে, তাজমহল নিয়ে এই নতুন আইনি লড়াই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এটি শুধু একটি সৌধের ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং ভারতের ঐতিহাসিক বক্তৃতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্যও একটি পরীক্ষা। আদালতের সিদ্ধান্ত এই বিতর্কের সমাধান করবে নাকি আরও জটিল করবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত, তাজমহলের গায়ে নতুন করে পড়েছে প্রশ্নচিহ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার অধিকার সবার রয়েছে। কিন্তু সেই খোঁজ যাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট না করে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ঐতিহাসিক সত্য উদঘাটন করা জরুরি, কিন্তু তা হতে হবে বিজ্ঞানসম্মত ও নিরপেক্ষ উপায়ে। আশা করা যায়, আদালত সেই পথেই এগিয়ে যাবে। আর তাজমহলের মহিমা অক্ষুণ্ণ থাকবে, সেটাই সবার কামনা।

গণবার্তা

সম্পাদকঃ নূর মোহাম্মদ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা